শিলিগুড়ি

নো ম্যান্স ল্যান্ডে ১০০ পরিবারের নতুন ভোর!

বিশেষ প্রতিবেদন:

পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার আলো: চম্পকগছের নো ম্যান্স ল্যান্ডে ১০০ পরিবারের নতুন ভোর!

স্বাধীনতার ৭৮ বছর পেরিয়েছে। দেশ এবার ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের দোরগোড়ায়। কিন্তু উত্তরবঙ্গের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ফুলবাড়ির চম্পকগছ গ্রামের একশোটি পরিবারের কাছে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ যেন এতদিন কেবল ইতিহাস বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।নিজ দেশে পরবাসী তারা।  ভারতীয় হয়েও এতদিন  বাস করতেন কাঁটাতারের ওপারে, নো ম্যান্স ল্যান্ডে-হ্যাঁ ভারতীয় নাগরিক, রয়েছে ভোটার কার্ড আধার কার্ড সবই অথচ নিজ দেশের মাটিকে স্পর্শ করতে কাঁটাতার পেরিয়ে বিশেষ অনুমোদন নিয়ে আসতে হয় তাদের।নিজ দেশের মাটিতেই এক অদৃশ্য বন্দিদশা।

অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। আধুনিক ত্রিস্তরীয় স্মার্ট ফেন্সিং নির্মাণের অংশ হিসেবে গ্রামটিকে স্থানান্তর করা হয়েছে কাঁটাতারের এপারে। বহু দশকের বন্দিজীবনের পর আজ তাদের চোখে জল। তবে চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়া সে অশ্রু শৃঙ্খলা ভাঙা মুক্তির।

চম্পকগছের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা মলিনা নিশার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। তাঁর কথায়, “আমাদের পূর্বপুরুষরা ৭০-৮০ বছর ধরে এই মাটিতে থেকেছেন। কিন্তু স্বাধীন দেশে থেকেও কখনও স্বাধীন ছিলাম না। বিএসএফের অনুমতি ছাড়া চলাফেরা করা যেত না। সন্ধ্যা নামলেই জীবন থেমে যেত। আজ মনে হচ্ছে সত্যিই স্বাধীন হলাম।”

এই গ্রামে এখন প্রায় ১০০টি পরিবার, প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারের সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি। একসময় যেখানে ছিল মাত্র পঞ্চাশটি বাড়ি, সময়ের সঙ্গে পরিবার বেড়ে সেই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। অথচ জীবনযাত্রার সংকীর্ণতা একটুও কমেনি।

বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে যেত শুধু ঠিকানার কারণে। আত্মীয়-স্বজন আসতে চাইতেন না। রাতের অন্ধকারে কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে পৌঁছানো ছিল এক অনিশ্চিত লড়াই। সামাজিক অনুষ্ঠান যেন তাদের জীবনের বাইরে থাকা এক বিলাসিতা।

কৃষক শফিউলের দিনও ছিল নিয়মের বেড়াজালে বন্দি। আগে সন্ধ্যা ছটার পর বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষিদ্ধ ছিল। নিজের জমিতে কাজ করতেও নানা বিধিনিষেধ পেরোতে হতো। এখন বিএসএফ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কাঁটাতারের ওপারের জমিতে গিয়ে চাষাবাদের সুযোগ দিচ্ছে। ধানের চারা রোপণের ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর চোখে আজ ভবিষ্যতের স্বস্তি।

মহম্মদ কাসিম বলেন, “আমাদের উপার্জনের আর কোনো পথ নেই। এই জমিই আমাদের জীবন। এখন অন্তত মনে হচ্ছে বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবা যাবে।”

চম্পকগছ শুধু একটি গ্রাম নয়; এটি ছিল স্বাধীনতার মানচিত্রে আঁকা এক অসমাপ্ত গল্প। যেখানে হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে শতাধিক পরিবার একই কষ্ট, একই অনিশ্চয়তা আর একই অপেক্ষা ভাগ করে নিয়েছে বছরের পর বছর।

এদিকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে কেন্দ্র সরকার দ্রুতগতিতে আধুনিক স্মার্ট ফেন্সিং গড়ে তুলছে। সীমান্তে সীমান্ত-দস্যুদের দাপট বৃদ্ধি এবং বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ত্রিস্তরীয় এই ফেন্সিংয়ে থাকছে অত্যাধুনিক নজরদারি ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। নিরাপত্তা আরও মজবুত করতেই জিরো লাইনের ১৫০ গজের ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকা চম্পকগছ গ্রামটিকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই প্রকল্পের উদ্বোধন উপলক্ষে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে পুরো এলাকা কার্যত নিরাপত্তার বলয়ে ঢেকে ফেলা হয়। টানা ১৫ দিন সীমান্তঘেঁষা একমাত্র সংযোগকারী রাস্তা বন্ধ রাখা হয়। নারায়ণজোত, চতুরাগছে, জুম্মাগছ ও চম্পকগছ-সহ কয়েক হাজার বাসিন্দাকে প্রতিদিন দীর্ঘ ঘুরপথে যাতায়াত করতে হয়েছে। এমনকি এলাকার একমাত্র বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দু’দিন বন্ধ ছিল।

জুম্মাগছের সরকারি কর্মী সুরখী বর্দি বলেন, “প্রতিদিন অতিরিক্ত দু’ঘণ্টা সময় লাগত। তবে জরুরি অসুস্থতার সময় বিএসএফ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সোমবার থেকে রাস্তা খুলে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে।”

সন্ধ্যা নামছে। নতুন কাঁটাতারের এপারে শিশুদের হাসি ভেসে আসছে। অনেকের চোখে তখনও জল। তবে সেই জল আর ভয়ের নয় এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের।

চম্পকগছের মানুষের কাছে স্বাধীনতা এ বছর শুধু জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; স্বাধীনতা মানে প্রথমবার নিজের দেশে আর পরবাসী না থাকার নিশ্চয়তা। স্বাধীনতা মানে সন্তানের বিয়ের স্বপ্ন, অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর ভরসা, উৎসবে আত্মীয়দের আগমন, আর সন্ধ্যার পরও বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার।
চম্পকগছের আকাশে উড়ছে শুধু তেরঙ্গা নয়,উড়ছে বহু প্রজন্মের জমে থাকা মুক্তির দীর্ঘশ্বাস।