রাজ্য জুড়ে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধীকরণ পোর্টালের জট, চূড়ান্ত ভোগান্তি,
ডব্লিউবিসিএস সফল চাকরি প্রার্থীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আটকে, সদ্যজাত সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশি দম্পতির দেশে ফেরা অনিশ্চিত
শিলিগুড়ি।জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধীকরণ পোর্টাল বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তির মুখে সাধারণ মানুষ। চাকরিতে যোগদানের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে নিজ দেশে ফেরা সর্বত্রই তৈরি হয়েছে জটিলতা। ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় সফল এক প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন আটকে রয়েছে জন্ম শংসাপত্র যাচাই না হওয়ায়। অন্যদিকে, চিকিৎসার জন্য ভারতে এসে সন্তানের জন্ম দেওয়া এক বাংলাদেশি দম্পতি জন্ম শংসাপত্র না পাওয়ায় দেশে ফিরতে পারছেন না। মেডিকেল ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে তাঁদের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
রাজ্যের তিনটি জেলার জন্ম ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানের মধ্যে গরমিল ধরা পড়ায় রাজ্য সরকার সমস্ত পুরসভায় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধীকরণ পোর্টাল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে বর্তমানে নতুন করে জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্তকরণ কার্যত স্তব্ধ। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক নিবন্ধন হলেও পুরসভার মাধ্যমে শংসাপত্র ইস্যু করা যাচ্ছে না।
এর জেরে প্রতিদিন সকাল থেকে শিলিগুড়ি পুরনিগমে ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও জন্ম বা মৃত্যু শংসাপত্র ছাড়াই ফিরতে হচ্ছে আবেদনকারীদের।
উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে শিলিগুড়িতে শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, সিকিম, বিহার, নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশ থেকেও বহু মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য আসেন। ফলে এখানকার হাসপাতালগুলির পাশাপাশি পুরনিগমের ওপরও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধীকরণের অতিরিক্ত চাপ থাকে। পোর্টাল বন্ধ থাকায় এই পরিষেবা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সমস্যায় পড়েছেন শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিপ্লব রায়। ২০২৩ সালের ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় ১৪তম স্থানাধিকারী বিপ্লব রায়ের পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হলেও জন্ম শংসাপত্র যাচাই না হওয়ায় তাঁর নিয়োগপত্রের প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে।
বিপ্লবের বাবা, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মী তপন রায় জানান, “ছেলের সমস্ত নথির যাচাই শেষ হয়েছে। শুধু জন্ম শংসাপত্রের ভেরিফিকেশন বাকি। সারাদিন পুরনিগমে ঘুরেও কোনও সমাধান পাইনি।”
পুরনিগম সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৫২ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জন্ম-মৃত্যুর রেজিস্টার সম্প্রতি পুলিশ তদন্তের স্বার্থে বাজেয়াপ্ত করেছে। ফলে পুরনিগমের হাতে মূল রেকর্ড না থাকায় জন্ম শংসাপত্র যাচাই বা প্রয়োজনীয় সিলমোহর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিন বিজেপি নেতা, প্রাক্তন কাউন্সিলর তথা পুরনিগমের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কো-অর্ডিনেটর অমিত জৈন বলেন, “আমার এলাকার এক মেধাবী ছাত্র এই সমস্যার কারণে চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়েছে। পুরনিগম জানিয়েছে, রেকর্ড পুলিশ বাজেয়াপ্ত করায় তাদের পক্ষে ভেরিফিকেশন করা সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে কমিশনারের সঙ্গে কথা বলব।”
একই সমস্যায় পড়েছেন বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য আসা এক দম্পতি। বাংলাদেশের এক ব্যাংককর্মী জানান, আইভিএফ চিকিৎসার মাধ্যমে শিলিগুড়ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁদের সন্তানের জন্ম হয়েছে। হাসপাতাল প্রাথমিক নিবন্ধন করলেও পুরনিগম থেকে জন্ম শংসাপত্র না পাওয়ায় নবজাতককে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “জন্ম শংসাপত্র না থাকায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হবে। অথচ আমাদের মেডিকেল ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে।”
একইভাবে ভিন জেলা, বিহার ও সিকিম থেকে চিকিৎসার জন্য আসা বহু মানুষও জন্ম-মৃত্যু সংক্রান্ত নথিপত্রের অভাবে সমস্যার মুখে পড়েছেন।চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে বিশেষ করে ভিন রাজ্যের বাসিন্দাদের। সরকারি আধিকারিকরা গোলযোগের বিষয়ও জানালেও কবে নাগাদ পোর্টাল খুলবে মিলবে শংসাপত্র তারও কোন সঠিক উত্তর দিতে পারছেন না আবেদনকারীদের।
এ বিষয়ে শিলিগুড়ি পুরনিগমের কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষকেও বার্তা পাঠানো হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।


