শিলিগুড়ি

রোমহর্ষক স্বীকারোক্তি! স্ত্রীকে খুন করে থানায় ফোন ব্যাংক কর্মীর,স্ত্রীর মৃতদেহের সঙ্গেই ৭২ঘন্টা এক ঘরে

 

শিলিগুড়ি। ভোট মুখী ব্যাস্ততায় মগ্ন পুলিশ! সে সময়ই  বেজে ওঠে ফোন আর ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে এক চমকে ওঠা স্বীকারোক্তি! ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে ঠান্ডা এক ভদ্রলোকের গলা-“আমি আমার স্ত্রীকে খুন করেছি।ছেলেকে খুন করে আমি মালদার দিকে আমার ছেলেকে রাখতে যাচ্ছি। এসে যোগাযোগ করবো। কোথায় দেহ জিঙ্গাসায় নির্দিষ্ট ঠিকানা বাতলে দেয় পুলিশ অফিসারকে খুনের অভিযুক্ত। পুলিশকে ফোনে জানায় হালের মাথা (এলাকার নাম) তিনতলায় ফ্ল্যাট আমাদের। সেখানে ফ্ল্যাটের বাইরে জুতোর রাখার স্থানে চাবি পাবে, ভেতরে বেডরুমে আছে স্ত্রীর দেহ। ফোনের রিসিভার নামিয়ে দ্রুত তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে পুলিশ টিম ছোটে নির্দিষ্ট ঠিকানায়।এমনই এক রোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী থাকল মাটিগাড়া, শিবমন্দির এলাকা।
মৃতা দেবলীনা ব্যানার্জী, পেশায় বালাসন জুনিয়র বেসিক স্কুলের শিক্ষিকা। অভিযুক্ত তার স্বামী অনিন্দ্য ব্যানার্জি, একজন ব্যাংক কর্মী। তাঁদের এগারো বছরের এক নাবালক শিশুপুত্রও আছে।
বুধবার সকালে, ভোটের ব্যস্ততার মধ্যেই মাটিগাড়া থানায় আসে সেই ফোনকল। ফোন রিসিভ করতেই চমকে ওঠেন পুলিশকর্মীরা। অপরপ্রান্ত থেকে অনিন্দ্য জানায়, সে স্ত্রীকে খুন করেছে এবং ছেলেকে নিয়ে মালদার দিকে যাচ্ছে। পুলিশের জিজ্ঞাসায় সে নিজেই জানায় ফ্ল্যাটের নির্দিষ্ট ঠিকানা শিবমন্দিরের ‘হালের মাথা’ এলাকার তিনতলার ফ্ল্যাট, যেখানে জুতোর র‍্যাকের পাশে রাখা চাবি দিয়ে ঢুকে বেডরুমে পাওয়া যাবে স্ত্রীর দেহ।
এক মুহূর্ত দেরি না করে পুলিশ পৌঁছে যায় ঘটনাস্থলে। অভিযুক্তের কথামতোই ফ্ল্যাটের বাইরে মেলে চাবি, আর ভিতরে বেডরুমে কম্বলে মোড়া অবস্থায় উদ্ধার হয় দেবলীনার নিথর দেহ। তদন্তে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি ওয়েস্ট কাজী শামসুদ্দিন আহমেদ। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ পাঠানো হয় উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, শ্বাসরোধ করেই খুন করা হয়েছে মহিলাকে। গলায় টিপে দড়ি-কাপড় জাতীয় কিছু পেঁচিয়ে এই খুনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান পুলিশের। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য মৃত্যুর প্রায় ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর দেহে পচন ধরতে শুরু করে। সেই সময়টুকু অভিযুক্ত নিজের ফ্ল্যাটেই স্ত্রীর মৃতদেহের সঙ্গে কাটিয়েছে বলেই মনে করছে পুলিশ।
স্ত্রীকে খুন করার পরও নাবালক ছেলেকে নিয়ে একই ফ্ল্যাটে ছিল অনিন্দ্য। কিন্তু দেহ থেকে দূর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করতেই ধরা পড়ার আশঙ্কায় শেষমেশ পুলিশের দ্বারস্থ হয় সে নিজেই। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান রবিবার গভীর রাত থেকে সোমবার সকালের মধ্যেই গোটা ঘটনা। তবে ঠিক কি কারণে খুন তা এখনও অজানা!
তদন্তে উঠে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, শেষবার গত রবিবার দুপুরে দেবলীনাকে দেখা গিয়েছিল। এরপর আর তাঁকে কেউ দেখেনি। গৃহপরিচারিকা কল্পনা রায় জানিয়েছেন, রবিবার ছুটি থাকায় তিনি কাজে আসেননি। সোমবার সকালে এলে গৃহকর্তার আচরণ অস্বাভাবিক মনে হয়। বিশেষ করে বেডরুমে ঢুকতে বারবার বাধা দেওয়া এবং দ্রুত কাজ সেরে বেরিয়ে যেতে বলায় সন্দেহ বাড়ে। বেডরুমে ফ্যান চলছিল, আর সে ঘর আগলেরেখেছিল অভিযুক্ত।

অবশেষে টাওয়ার লোকেশন ধরে মালদা থেকে অনিন্দ্য ব্যানার্জিকে গ্রেপ্তার করে মাটিগাড়া থানার পুলিশ। জানা গিয়েছে, শিবমন্দিরে কর্মসূত্রে থাকলেও অভিযুক্তের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য মালদাতেই থাকেন। ছেলেকে আত্মীয়দের কাছে রাখতেই সে সেখানে গিয়েছিল।
শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (ওয়েস্ট) কাজি সামসুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, অভিযুক্তকে বুধবারই মালদা থেকে আটক করে আনা হয়েছে। ঠিক কী কারণে এই খুন, তা জানতে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। বৃহস্পতিবার অভিযুক্তকে শিলিগুড়ি আদালতে পেশ করা হবে।
একটি সাধারণ পরিবারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বিভীষিকা এখন প্রশ্ন তুলছে কী এমন ঘটেছিল, সাইলেন্ট কিলার এর মতো ৪৮ থেকে ৭২ ঘন্টা আগে স্ত্রী কে খুন করে তার মৃতদেহের সঙ্গেই ওই বন্ধ ফ্ল্যাটে  মৃতদেহের সঙ্গে কাটায় অভিযুক্ত। দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাতেই এদিন পুলিশকে জানায় বলেই মনে করছেন পুলিশের তদন্তকারী টিম।

খুনের কারন সন্ধানে বুধবার রাতে অভিযুক্তকে টানা জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয়।