উত্তরবঙ্গের অপরাধ তদন্তে এবার বড়সড় প্রযুক্তিগত শক্তিবৃদ্ধি। পুলিশের হাতে আসছে ফরেন্সিকের আধুনিক চাবিকাঠি। অপরাধী শনাক্তকরণ থেকে জটিল মামলার তদন্ত সব ক্ষেত্রেই বাড়বে গতি ও নির্ভুলতা। জলপাইগুড়ি রিজিওনাল ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে (আরএফএসএল) চালুর মুখে নতুন দুই বিভাগ ফিজিক্স ও ব্যালেস্টিক ফরেন্সিক। পাশাপাশি শিলিগুড়িতে সাব-ডিভিশনাল ফরেন্সিক ল্যাব গড়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
শিলিগুড়ি। উত্তরবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ফরেন্সিক পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে রাজ্য। জলপাইগুড়ি রিজিওনাল ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে নতুন করে চালু হতে চলেছে ব্যালেস্টিক ও ফিজিক্স ফরেন্সিক বিভাগ। এর পাশাপাশি মালদা-সহ রাজ্যের আরও পাঁচটি জায়গায় নতুন রিজিওনাল ফরেন্সিক ল্যাব তৈরির প্রস্তাবেও মিলেছে অনুমোদন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ২৫টি মোবাইল ফরেন্সিক ভ্যান চালুর সবুজ সংকেতও দিয়েছে রাজ্য সরকার।
এই পরিকাঠামো উন্নয়নের ফলে উত্তরবঙ্গে বহুদিন ধরে আটকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে পুলিশ প্রশাসন। বিশেষ করে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারার কার্যকর প্রয়োগে ফরেন্সিক রিপোর্ট অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। ফলে আধুনিক ফরেন্সিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ তদন্ত ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করবে।
এতদিন জলপাইগুড়ি আরএফএসএলে মূলত বায়োলজি ও টক্সিকোলজি বিভাগের নমুনা পরীক্ষার কাজ হতো। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্র, গুলিবর্ষণ, শ্যুটআউট বা বিস্ফোরণ সংক্রান্ত মামলার নমুনা পরীক্ষার জন্য নির্ভর করতে হতো কলকাতার স্টেট ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির উপর। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা নমুনা প্রথমে জলপাইগুড়িতে এসে সেখান থেকে কলকাতায় পাঠানো হতো। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলে তদন্তে বিলম্ব হওয়ার পাশাপাশি নমুনার গুণগত মান প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যেত।
উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেন্সিক বিভাগের প্রধান রাজীব প্রসাদ জানান, জলপাইগুড়িতে ব্যালেস্টিক ও ফিজিক্স বিভাগ চালু হলে দ্রুত নমুনা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এতে পুলিশের তদন্ত যেমন দ্রুত হবে, তেমনি ফরেন্সিক বিশ্লেষণও আরও নিখুঁত হবে।
ব্যালেস্টিক ফরেন্সিক মূলত আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, কার্তুজ, গানপাউডারের চিহ্ন এবং অস্ত্র ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করে। কোন বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, কত দূর থেকে গুলি চালানো হয়েছে বা একই আগ্নেয়াস্ত্র আগে অন্য কোনও অপরাধে ব্যবহার হয়েছে কি না এসব তথ্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও কার্তুজ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দ্রুত হাতে পাবে তদন্তকারী সংস্থা।
অন্যদিকে ফিজিক্স ফরেন্সিক বিভাগ দুর্ঘটনা, অগ্নিসংযোগ, বিস্ফোরণ বা যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতির মতো ঘটনায় বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। তদন্তকারীদের মতে, এর ফলে ঘটনাস্থলের তথ্য বিশ্লেষণ আরও নির্ভুল হবে এবং তদন্তের গতি বাড়বে।
স্টেট ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও ইনচার্জ আইপিএস কে. জয়রামন জানান- জলপাইগুড়ির পাশাপাশি সিঙ্গুর, বর্ধমান, মালদা-সহ আরও কয়েকটি জায়গায় নতুন রিজিওনাল ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাব তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মামলার সংখ্যা ও অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করেই এই স্থানগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব এলাকায় অপরাধের চাপ বেশি, সেখানে ভবিষ্যতে সাব-ডিভিশনাল ফরেন্সিক ল্যাব তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। সেই তালিকায় গুরুত্ব পাচ্ছে শিলিগুড়ি মহকুমা।
ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গে ৩২টি মোবাইল ফরেন্সিক ল্যাব চালু হয়েছে। এবার আরও ২৫টি অত্যাধুনিক মোবাইল ফরেন্সিক ভ্যান নামানোর প্রস্তুতি চলছে। প্রতিটি জেলায় বর্তমানে একটি থেকে দুটি ভ্যান রয়েছে। সেখানে ভ্যানের মামলার সংখ্যা ও এলাকার ব্যাপ্তির নিরিখে সংখ্যাকে সাতজনের বিশেষজ্ঞ দল। পুলিশ সূত্রে খবর, ফরেন্সিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে পুলিশকর্মীদেরও। তবে নতুন পরিকাঠামো সম্পূর্ণভাবে চালু করতে ৩০০-র বেশি ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ও অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।


